লেখার জন্য বইমেলা জিনিসটা আমাদের কাছে খুব একটা নতুন বিষয় নয়। আমি নিজেও এর আগে নানান বয়সে বইমেলা নিয়ে প্রচুর লেখা লিখেছি। বয়সের সাথে অভিজ্ঞতাটাও পাল্টেছে, অতএব লেখাও। ২০১৬ তে আমার বন্ধু বইমেলার জন্য বেরনোর আগে জিজ্ঞেস করেছিলো “বলছি খাবি কোথায়?” আমার কাছে তখন কোনো উত্তর ছিলো না, আজ ও বেরোনোর সময় নেই। জানি প্রচুর স্টল বসে, কোনো না কোনো একটা ব্যবস্থ্যা হয়ে যাবে। কলকাতায় মেলার অভাব নেই। পৌষ, চরক, রাশ, চলচিত্র, শিল্প। এবং সবেতেই খাওয়া দাওয়া নাহলে সেটা সম্পূর্ণ হয়না। আসলে বাঙালির কাছে প্রতিটি মেলা যেনো কোনো না কোনো ভাবে খ্যাদ্যমেলাএ রূপান্তরিত হয়। আজকাল আবার আলাদা করে বিরিয়ানি মেলা বা খাদ্য মেলাও হয়। খাবারের স্টল না থাকলে হেসে খেলে ৬০ শতাংশ লোকের ভিড় কম হবে। এমনকি যেকোনো অনুষ্ঠানেই বাঙ্গালীর পেট না ভরলে মন ভরে না। কোনো শ্রাদ্ধ বাড়িতে গিয়েও যদি বাঙ্গালীর পাতে শুক্ত বা মাছের ঝোল কম পড়ে তো সে নিন্দা করতে ছারেনা। আমার মামা একবার তার সহকর্মীকে জিজ্ঞেস করেছিল “কি মশাই, কেমন গ্যাংটক ঘুরলেন?”। সহকর্মী মহা আনন্দের সাথে বলেছিলেন “দারুণ! কব্জি ডুবিয়ে মাংস খেয়েছি”...মামা হতবাক। কিন্তু আজ আমি খাবার নিয়ে বিশেষ কিছু বলবো না। হ্যাঁ পেটুক বাঙালি, আজ আলোচনার বিষয় খাবার নয়।
খুব স্বাভাবিক ভাবে যেহেতু ৪ বছর পর আবার যাচ্ছি, বলা বাহুল্য পরিবর্তন আশা করছিলাম। ২০১৬-র আগে ২০১৩ তে শেষবারের মতো যাই। এই ধারাবাহিক ভাবে না যাওয়ার কারণ হলো আমার ২০১৩ তে দেশ ছাড়া। তারপর যতবার কলকাতা যাই, বইমেলার সময় টা আশার আগে আমাকে কাজের জন্য কলকাতা ছেড়ে বেড়িয়ে যেতে হয়। তারপর সমস্যা হলো বইমেলার বর্তমান অবস্থান ও যাতায়াতের অসুবিধে। বইমেলার পরিবেশ অনেকদিন ধরে একইরকম ছিলো। ১৯৭৬ থেকে মেলা শুরু হলেও, আমার জ্ঞানতঃ দেখে আসছি এটা ময়দানে অনুষ্টিত হতে। দীর্ঘ ৩১ বছর পর নানান রাজনৈতিক টানাপোড়েনের শেষে ময়দান থেকে বইমেলা উঠে যখন ২০০৭ এ সেটা যুব ভারতী ক্রীড়াঙ্গনে স্থানান্তরিত হলো, তখনই বুঝলাম আমার বাবা-মা আর দক্ষিণ কলকাতার বেহালা থেকে অতদূর আমাকে বইমেলা নিয়ে যাবেনা। তাছাড়া আমি ততদিনে স্কুলের গন্ডি পার করে এসেছি। অতএব আমি স্বাধীন, বা অন্তত বাবা-মার দায়িত্ব নয় আমাকে বইমেলা নিয়ে যাওয়ার। তারপর ২০০৯ তে আবার সেটা গিয়ে উঠলো মিলন মেলায়। সেটাও আমার বাড়ি থেকে আপেক্ষিক ভাবে দূরেই, এবং পরিবহনের ভালো সমস্যা আছে। কলকাতায় প্রচুর মানুষের নিজস্ব গাড়ি আছে অথবা মোটা টাকা ট্যাক্সি ভাড়া দিতে তাদের অসুবিধে নেই। আমার কলেজে পড়াকালীন কোনোটাই ছিল না, তবুও প্রচুর অসুবিধের মধ্যেও প্রতি বছর নিয়ম করে মেলাটাতে যেতাম। এবার জানলাম মেলা নাকি আবার মিলন মেলা থেকেও উঠে গিয়ে সল্টলেক সেন্ট্রালপার্ক মেলায় হয়েছে। ৪ বছর পর যাওয়ার আবেগে পৌঁছনোর আগের মুহূর্ত অবধি জানতাম না এই স্থানান্তর হওয়ার খবরটা। একেই মাঝের হাট ব্রিজ ভেঙে পড়াতে বেহালা যেন বাকি শহরটা থেকে বিচ্ছিন্ন, তারওপর এই নতুন জায়গায় হওয়ার জন্য আমার বাড়ি থেকে যেন আরো দূর চলে গেলো বইমেলাটি। জানিনা কোন রাজনৈতিক কারণে এবার এই সিদ্ধান্তটি নেওয়া হয়েছে। বইমেলা আমাদের শহরের এখনো অবধি এই একটাই মাত্র অনুষ্ঠান যেটা আমাদের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির এক প্রতিচ্ছবি। বারবার জায়গা পরিবর্তন হওয়াতে আমার বাবা-মার মতো বহু পুরোনো আমলের বই পড়ার মানুষের যাতায়াত কমে গেছে, আর বেড়ে গেছে বেনফিশ-এর মাছের চপ খেয়ে নিজস্বী তোলার লোকজন। তাছাড়া এমনিতেই মাল্টিপ্লেক্স আমাদের সিনেমার সংস্কৃতি টাকে তছনছ করেছে। অন্তত বইমেলাটাকে ভালো ভাবে বাঁচিয়ে রাখা সরকারের একটা উদ্যোগ হওয়া উচিত।
এই এতো আবেগ, প্রতিবাদ, উত্তেজনার কারণ হলো জ্ঞান হওয়ার পর থেকে ২০০৭ অবধি সময়টাতে বইমেলা পরিদর্শন করাটা। আমি যেন সারাবছরে পুজোর থেকে বইমেলার জন্য বেশি অপেক্ষা করতাম। রোজগার তো আর করতাম না, কাজেই দিদা-ঠাকুমা দের থেকে যা আমদানি হতো সেটা বইমেলায় নির্ধিধায় খরচ করতাম। মেলাটি হতো আমাদের বার্ষিক পরীক্ষার ঠিক আগে আগে আর পরীক্ষার পরেই থাকতো একমাস ব্যাপী একটা ছুটি। স্বাভাবিক ভাবে লক্ষ্য থাকতো ওই ছুটির মধ্যে সদ্য কেনা বই গুলো শেষ করা। বলা বাহুল্য যে সেই বই গুলো ছুটি শুরু হওয়ার আগেই শেষ হতো। বইমেলাতে ঢুকলে যেন একটা তথ্য, অভিজ্ঞতা আর অনুভূতির একরাশ ঢেউ চলে আসতো আমার ওপর। আমি কখনো আগে থেকে ঠিক করে যেতাম না কোন বই কিনবো বলে। আর ঠিক কেন জানিনা, বাকি ছেলেপিলেরা যেসব বই পড়তো, আমার যেন সেগুলো ঠিক পড়তে ইচ্ছে করতোনা। কারণ সেগুলোকে বাদ রাখলেও বইমেলায় লক্ষাধিক লোকের বই পাওয়া যায়। তাদের কেউ চেনেনা, জানেনা, অথচ তারা লিখেছে, মনের ভাব প্রকাশ করেছে, গল্প দিয়ে বিনোদন দেওয়ার আপ্রাণ চেষ্টা করেছে। আমি পাগল হয়ে যেতাম সেটা ভেবে। একটা রঙের বই থেকে রান্নার বই, সেলাইয়ের বই থেকে বিশ্বযুদ্ধ কি নেই সেখানে। ভেবেই পেতাম না কোন বই ছেড়ে কোনটা কিনবো। একটু বড় হতে দেখতাম, আমার প্রচুর বন্ধুদের মধ্যে বেস্টসেলার-দের পড়ার একটা ইচ্ছে। আমি বইমেলাতে গিয়ে সেগুলো কখনো খুজতাম না। মাঝে মাঝে আগে থেকে ঠিক করে রাখতাম কোনটা কিনবো, এবং সেগুলো কিনতাম ও। কেনা হয়ে গেলে আমি ফিরে আসতাম না। লক্ষ্যহীন ভাবে যেকোনো দোকানে ঢুকে গিয়ে সেখানে কি বই পাওয়া যায় সেটা বোঝার চেষ্টা করতাম। ভাবতাম, যে এই দোকানে কেন এই বই গুলোই আছে? কেন অন্যধরণের বই নেই? এই বই গুলো যারা লেখে তারা তো সবাই বিখ্যাত নয়, তাহলে তারা করা? আচ্ছা, তাদের বই তো অত বিক্রি হচ্ছেনা, তাদের অনুভূতি কেউ পড়ছেনা। তাদের নিশ্চই খারাপ লাগছে। আবার দেখতাম একই বিষয়ে নানা লোকজনের বই। তথ্য বদলানো যায়না, কিন্তু কতটা তথ্য একটা বইতে দিলে পাঠকরা বিরক্ত হবেনা সেটা একটা লেখক কিকরে ঠিক করলো? আরো মাঝে মাঝে খুজতাম সেসব বই যেগুলো সাধারণত বইমেলা ছাড়া আর কোথাও পাওয়া যায়না। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে সেগুলোর দাম গগনচুম্বী হওয়ার জন্য সেগুলো কেনা হতোনা। মনে মনে ভাবতাম, একদিন টাকা হলে কিনবো। প্রতি বছরই অন্তত দুবার যেতাম মেলায়। বাবা-মার সাথে যাওয়া, দুপুর দুপুর করে খেয়েদেয়ে বেরোনো, রাতে হোটেলে খেয়ে বাড়ি ফেরা, আর সর্বোপরি নিজের পকেট থেকে টাকা দিয়ে নিজের জন্য কিছু কেনা। এই বিরল আর্থিক স্বাধীনতাটা ওই বয়সে আমি সারাবছরে বইমেলা ছাড়া আর কোনো ক্ষেত্রেই পেতামনা। ক্রীত দ্রব্যগুলো বই হওয়ার জন্য কেউ সেই অল্প বয়সের স্বাধীনতাটাকে প্রশ্ন করতে পারতো না। অনেকেই বলতো “বইমেলা থেকে কিনলি? ওগুলো তো কলেজ স্ট্রিটে কমে পাওয়া যায়”। তাদের মধ্যে ওই বইমেলা থেকে বই কেনার যে অনুভূতিটা সেটার অভাব আছে ভেবে আমার তাদের ওপর খুব মায়া লাগতো। যেন কেউ বলছে পুজোয় ঠাকুর দেখলি কেন? যা বাবাঃ আমি কি মাছের চপ খেতে অতদূর যাবো নাকি?
আমাদের রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী বর্তমানে মহামারী কে কেন্দ্র করে যে উদ্যোগ নিয়েছেন সেটি প্রশংসনীয়। তাও শহর জুড়ে সব জায়গায় বিনাকারণে ওনার মুখ দেখা যায় বিভিন্ন পোস্টারে। আমাদের বিমানবন্দর থেকে বেঙ্গল কেমিকাল অবধি রাস্তার একদিকে ১০০ খানা পোস্টার এ ওনার ছবি দেখার পর আমি গোনা বন্ধ করি। কাজেই বইমেলায় জাগোবাংলার পর্বতপ্রমাণ ষ্টল দেখায় আমি খুব বেশি অবাক হইনি। সেটাকে কেন্দ্র করে একটা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও হচ্ছে। সেখানে বিক্রি হচ্ছে ওনার লেখা ৯৫০ খানার মতো বই। ওনার লেখনী ক্ষমতা নিয়ে আমি আলাদা করে কিছু বললাম না। যারা জানেননা তাদের না জানাই ভালো। বাকি যারা অনেকদিন পর বইমেলায় যায় এবং যাদের কাছে বইমেলাকে কেন্দ্র করে একটা আলাদা আবেগ আছে, তাদের মতো আমিও ঢুকে এটাই দেখছিলাম যে কতটা আগের থেকে আলাদা হয়েছে। পরিবর্তন আশা করছিলামই। বাইরের কাঠামো টা মিলন মেলায় থাকতে অন্যরকম ছিলো। একটু বেশি ধুলোময় এবং জায়গাটা যেন ময়দানের থেকে অনেকটা সংকীর্ণ লাগতো। বর্তমান স্থানটি একটু ছড়ানো, ধুলো কম, কিন্তু সেটা ময়দানের মতো ছড়ানো হয়। বইমেলায় প্রবেশ অনেক বছর ধরেই বিনামূল্যে ছিলো, এবছরও তাই। পরিবহনের সুবিধের জন্য পাশে অনেকটা জায়গা জুড়ে একটা বাস স্ট্যান্ড, যেখান থেকে প্রচুর বাসের ব্যবস্থ্যা করা হয়েছে শহরের বিভিন্ন অঞ্চলে যাওয়ার জন্য। ভেতরে মানুষজন অবশ্যই আগের মতো নয়। মোবাইল ফোন আসার পর থেকে লোকজন যেন সব কিছুর ছবি তুলে রাখার জন্য এবং সঙ্গে সঙ্গে সেটাকে সোশ্যাল মিডিয়াতে দেওয়ার জন্য প্রচণ্ড উদ়্গ্রীব। অস্বাভাবিক ভাবে ষ্টল গুলোর উচ্চতা যেন খুব ই কম। ময়দানে চলা কালীন একবার মূল থিম ছিল ফ্রান্স। সেবারে ফ্রান্সের লৌভরে পিরামিডের আদলে ফ্রান্সের ষ্টলটাকে বানানো হয়েছিলো এবং সেই অনুকরণ টি যথেষ্ট প্রশংসনীয়। এবারের থিম কি, সেটা না বলে দিলে বোঝা যাবেনা। সম্ভবত রাশিয়া ছিলো, আমারও বিশেষ কৌতূহল ছিলোনা। তবে এইসব বাইরের অলংকার কে কাটিয়ে বইমেলার একটা গভীর বিষয়বস্তু আছে, এবং সেটা হলো বই। আসলে বই ব্যাপারটা আমার কাছে বেশ বিস্ময়কর। হয়তো নিজের লেখার ইচ্ছে খুব একটা থাকেনা বলে। তাও আবার অন্যের পাঠের জন্য। আগে ভাবতাম তথ্যমূলক বই লেখা হয়তো উপন্যাস বা গল্পের থেকে সোজা। এখন বুঝি, একটা সঠিক তথ্যযুক্ত এবং গবেষিত বই লেখা সহজ ব্যাপার না। তবুও কোথাও যেন অনুভূতির বিশাল ব্যাপ্তি আমাকে এখনো তাক লাগিয়ে দে। বিশেষ করে কবিতা। মনে হয় যে কোনো মানুষ সঠিক শব্দ সহকারে মনের কথা ব্যক্ত করতে গিয়ে সঠিক ছন্দটাকে মাথায় রাখে কিকরে? এখনো সেই নানান ধরণের বই, নানান তথ্য, বিশ্লেষণ, অভিজ্ঞতা ও অনুভূতি। বইয়ের স্টলগুলোর ভেতরটা যেন একইরকম, সেটা আর পাল্টায়নি। কাঠের পরিকাঠামো, তার মধ্যে কাঠের তাক আর তারপর দাঁড় করিয়ে রাখা অজস্র বই। মনে হলো এই তো বাবা-মার সাথেই আছি। এদিক সেদিক যাচ্ছি, হাতের কাছে যেকোনো বই তুলে সেটার গন্ধ শুঁকছি। মনে হলো একটু পরেই শুনতে পাবো “চল, অন্য দোকান গুলোও দেখতে হবে”। আমার এবারেও ঠিক ছিল না কোন বই কিনবো। কিন্তু এটা ঠিক করে রেখেছিলাম যে কোন কোন ষ্টল গুলো খুঁজবো। ছোটবেলায় একটা দোকানে ঢুকতাম খুব “ফ্যামিলি বুক শপ”। এনাদের দোকান পার্ক স্ট্রিটে থাকা সত্ত্বেও, ছোটবেলায় এই দোকান থেকে অন্তত একটা বই কিনতাম। আমার স্ত্রী ঠিক করে রেখেছিল কি কিনবে। ওই দোকানটা থেকেই ও বেশিরভাব পছন্দের বই গুলো পেলো। ও আমার থেকে বেশি বই পরে এবং হালফিলের বেস্টসেলার-দের বইয়ের ব্যাপারে যথেষ্ট ওয়াকিবহাল। সময় লাগলো আমারই বেশি। একেই আমি খুঁজি যতরকমের দুষ্প্রাপ্য ও দুর্লভ বই যেগুলো সচরাচর বইমেলা ছাড়া আর কোথাও দেখা যায়না। তারওপর কেনার এতো বিকল্প। কয়েকটা বই কেনার পর আমি বেশিরভাগ সময়টাই বিস্ময়কর চোখে বই দেখে পার করে দিলাম। ও যখন ওর পছন্দের বই ইতিমধ্যে কিনেই ফেলেছে, আমি তখন যেনো ছোটবেলার মতো বইয়ের দোকান গুলোতে ঢুকে ভ্যাবলার মতো দাঁড়িয়ে থাকলাম আর ভাবলাম “এতো বই লেখার সময় পায় কিকরে লোকে, এতো অনুভূতি হয় কিকরে?” যখন অনুভূতির শ্রেষ্ঠ প্রতিষ্ঠান বিশ্ব-ভারতীর থেকে মুক্তি পান তখন তার প্রচুর বই বিভিন্ন স্টলে আরো বেশী করে বিক্রি হতে থাকে। এখন ওনার গান যে কেউ গাইতে পারে। বইমেলাতেও গাওয়া হয়। মিলন মেলায় একবার একজনের গলায় পাশ্চাত্য ভঙ্গিতে কিঞ্চিৎ রক স্টাইলে রবীন্দ্রসঙ্গীত শুনেছিলাম। কানে আঙ্গুল দিয়ে গগনে চেয়ে “হে ধরণী দুফাঁক হও” মার্কা মুখ করে চলে আসি সেখান থেকে।
আসার পথটা ছিলো যেন খুবই লম্বা এবং অসুবিধেজনক। সেটা হয়েছেও কিঞ্চিৎ আমারই জন্য। সব দোকান দেখে বেরুতে গিয়ে বেশ দেরীই হয়ে যায় আমাদের। হাতে প্রায় দশ খানা মতো বই নিয়ে ঠিক করি উবের বা ট্যাক্সি তে না ফিরে বাসে করে ফিরবো। হায় রে অনভিজ্ঞ। আমার আবার একটা অনবদ্য জেদ আছে যে কলকাতার বাস পরিসেবা খুবই ভালো, এবং শহরের যেকোনো প্রান্ত থেকে বেহালায় ফেরায় অসুবিধে হয়না। তারওপর আমার বাসে করে পুরো শহরের বুক চিরে যাতায়াত করতে বেশ ভালো লাগে। ট্যাক্সি তে যেটা করা যায়না। কিছুক্ষন পরেই ইঙ্গিত পেলাম যে সপ্তাহের মাঝখানে সন্ধ্যে ৭টার পর সেই ইচ্ছেটা চরিতার্থ করার উদ্যেশ্যটা আমাদের বেশ অসুবিধের মধ্যে ফেলবে। প্রায় একঘন্টা দাঁড়িয়ে থেকেও বেহালার বাস পাওয়া গেলোনা। শহরের বিভিন্ন প্রান্তের বাস চলে এলেও, বেহালার বাস আর এলোনা। বইমেলা তথা পুরো কলকাতা যেন বেহালা কে সত্যি ত্যাজ্য করে দিয়েছে বলে মনে হয়। অতএব যাত্রা ভেঙে আরো দু ঘন্টা বাসে যাতায়াত করে, দরকারের একটু বেশীই কলকাতাকে দেখে ও সারা রাস্তা ধরে স্ত্রীর কাছে গালাগাল খেয়ে কিঞ্চিৎ গভীর রাতে আমরা বাড়ি ফিরি।
সত্যি বলতে আমি জানিনা এতো ঝক্কির পর এতোকটা বই পড়ে উঠবো কিনা। যা বললাম, ২০০৭-এর পর থেকে আমার বাবা মা আর বইমেলায় যায়নি, এবারেও ব্যতিক্রম না। বিয়ের পর তাদের দায়িত্ব যেন আরও শেষ। ২০০৭-এ আমাদের বাড়িতে ইন্টারনেট আসে, এবং তার সাথে শুরু হয় আমার ইবুক পড়ার ইচ্ছে। ইবুক পড়তে আমার অসুবিধে হয়না। তাছাড়া বইয়ের গলাকাটা দাম টাও দিতে লাগেনা, বই রাখার জায়গাও বাঁচে। পকেটে টাকা বাড়লেও ইবুক, ময়দানে বইমেলা না হওয়া, বাবা-মার সঙ্গে না যাওয়া, সব মিলিয়ে আসতে আসতে বইমেলায় বই কেনার প্রবণতা টাও কমতে থাকে। আর তার সঙ্গে বই কিনে পড়ারও। সত্যি বলতে শৈশবের দিনগুলোকে আবার করে উপভোগ করার জন্যই যাওয়া। ঠিক কোনো পুরোনো বন্ধু বা পরিচিতির সাথে অনেকদিন পর দেখা হলে যা হয় “কিরে? ভালো আছিস তো? ভালো থাকিস, যাতে আবার তোকে দেখতে পাই। দেখিস, আমাকে না জানিয়ে উধাও হয়ে যাসনা যেনো।”
1 comment:
খুব ভালো লাগল। ছোটবেলার বইমেলা-স্মৃতিগুলি সব মনে পড়ে গেল। আরও লিখতে থাকে!
Post a Comment