Wednesday, April 29, 2020
আত্মিক
“মামি, মা কোথায় গো?” ৮ বছরের ছেলেটি সারাদিন খেলে এসে, ধুলোমাখা ময়লা কাপড় ও উসকো উসকো চুলে, খুবই সরল ভাবে তার মামিকে এই প্রশ্ন করে।
ছেলেটি কখনও তার বাবাকে দেখেনি। তার মা’কে ৫ মাসের অন্তঃসত্ত্বা রেখে তার বাবা মারা যান। তারপর থেকেই এই বাপ মরা ছেলেটিকে নিয়ে বিধবা মা থাকেন হাওড়ার উদয়নারায়নপুর গ্রামে, তাঁর দাদার কাছে। দাদা কলকাতাতে এক বিল্ডিং মেটিরিয়ালের দোকানে সামান্য কাজ করত। বাড়িতে তাঁর বিধবা বোন ও বোনপো ছাড়া ছিলো তাঁর স্ত্রী ও তিন ছেলেমেয়ে। ফলে, এতকটি মানুষের মুখে খাবার ও ছেলেমেয়েদের লেখাপড়ার জোগাড় করাটা, তাঁর একার রোজগারের পক্ষে সম্ভব হয়ে উঠত না। ছেলেটির মা বাড়ির কাজ করে বৌদিকে সাহায্য করার চেষ্টা করে যেতেন প্রতিদিন। চেষ্টা করতেন, যাতে ‘বাড়তি’ দুই মানুষের খাওয়াপড়ার জন্য যেন তাঁর দাদার সংসারে কোনোরকম অসুবিধে না আসে।
তাতে অবশ্য বৌদির রুক্ষ ব্যবহারের থেকে মুক্তি পাননি তিনি ও তাঁর ছোট ছেলে। ‘উড়ে এসে জুড়ে বসার’ জন্য মাঝে মাঝেই নানান রকম মুখঝামটার সম্মুখে পড়তে হয়েছে এই অভাগা মাকে। ফলে ‘মামার বাড়ির আবদার’ কথাটি আর যার জন্যই প্রযোজ্য হক না কেন, তাঁর ছেলের ক্ষেত্রে কখনই হয়নি।
ছোটো ছেলেটা অবশ্য সংসারের এসব কূটকচালের ব্যাপারে অনেকটাই অজ্ঞ ছিল। তার এবং তার মায়ের প্রতি তার মামির মনের বিষের ব্যাপারে সে কিছুই জানত না। মামার ছেলেদের নিজের ভাইদের মত ভালবাসত। এমনকি তারকেশ্বরে তাদের মামারবাড়িকে নিজের মামারবাড়ি বলে মনে করত। নিজের পড়াশুনা চালানোর সাথে, হাসি মুখেই বাড়ির ও তার মামির জন্য নানান আনুসাঙ্গিক কাজ করে দিত। আর তার জগৎ বলতে ছিল শুধুই তার মা। সারা সন্ধ্যে অপেক্ষা করে থাকত কখন তার মা তাঁর কাজ থেকে মুক্তি পাবেন। রাতে মায়ের ছেঁড়া আচলে মুখ গুঁজে ঘুমতে ঘুমতে শুনত তার বাবার গল্প। মায়ের মুখেই শোনা যে তার বাবা ছিলেন খুব জেদি।
মামি তখন সবার জন্য রান্না করতে করতে ঘেমে রয়েছেন। প্রশ্নটিতে মামি যেন একটু বেশিই রেগে গেলেন। রক্তবর্ণ চোখে ছেলেটার দিকে তাকিয়ে বললেন “তোর মা? তোর মা তোকে ছেড়ে মামারবাড়ি চলে গেছে”। কথাটি বলে মামি আবার কাজে লেগে গেলেন। তার অপ্রত্যাশিত এই উক্তিটি ছেলেটির সরল মনে কি প্রভাব ফেলল, সেদিকে না তাকিয়ে গজগজ করতে করতে ভাতের হাঁড়ি নামাতে লাগলেন। ওদিকে ছেলেটির কাছে কথাটা যেন একটা দ্রুতগতিতে এগিয়ে আসা তীরের মত এসে লাগল। তার মামি যে তাকে মিথ্যে বলতে পারেনা, সেই সন্দেহ তার সরল মনে একবারও লাগল না। সন্ধ্যেবেলা ফিরে এসে মা খোঁজ করলেন ছেলের। সবাইকে জিজ্ঞেস করেও ছেলের কোনো পাত্তা নেই। ব্যাকুল হয়ে উঠল মায়ের মন। সারা পাড়া খুঁজেও যখন ছেলের কোনো খোঁজ মেলেনা, তখন দিশাহারা হয়ে মা তাকায় তাঁর দাদার দিকে। দাদা সদ্য কাজ থেকে ফিরে এসে খোঁজ করতে বের হলেন। কিন্তু প্রায় পুরো গ্রাম খুঁজেও ছেলের খোঁজ পাওয়া গেলনা। মা জিজ্ঞেস করলেন বৌদিকে “আচ্ছা তুমি কি কিছুই জাননা?” বৌদি মুখঝামটা দিয়ে বলেন “আমার কি আর কাজ নেই?”
মধ্যরাতে হঠাৎ দরজায় আওয়াজ। তারকেশ্বরের বাড়ি থেকে লোক এসেছে। সঙ্গে ছেলেটি। পরনে সকালের কাপড়টাই। মামির কথা শোনা মাত্র সে দৌড়ে মায়ের খোঁজে গ্রাম থেকে মামারবাড়ি গেছে Train line অনুসরণ করে। যে ছেলে মায়ের সাথে তিন মাইল দুরত্ব সহ্য করতে পারত না, সেই ছেলে ত্রিশ মাইল দৌরে যাওয়ার আগে মোটেই দ্বিতীয়বার ভাবেনি। রাতে মায়ের সাথে শুয়ে অশ্রুপূর্ণ চোখে তাকিয়ে বলল “তুমি আমাকে ছেড়ে যাবেনা তো?” মা তার ছেড়া আচল দিয়ে ছেলের চোখ মুছিয়ে বলে “ধুর পাগল, তোকে ছেড়ে যেতে পারি?”
এরপর দুবছর পর হঠাৎ একদিন কাজ করতে করতে মায়ের হাতে প্রচণ্ড জোর চোট লাগল। তার দাদার কাছে আবদার করল “আমাকে চিকিৎসা করাতে কলকাতা নিয়ে যাবি?” ছেলের বুক প্রায় ফেটে যায়। মা’কে ছেড়ে থাকতে তার একটুও ভালোলাগেনা। আফসোস করতে লাগল যে সে নিজে তার মায়ের চিকিৎসা করাতে পারলনা কেন। তাহলে তার মাকে দূরে যেতে হত না। বায়না ধরল সেও সঙ্গে যাবে। কিন্তু মা ধমক দিয়ে বললেন “তোর লেখাপড়া আছেনা? তুই লেখাপড়া করবি, পরে বাড়ি করবি, আর আমরা সেখানে দুজনে থাকব কেমন? এখন সেসব ফেলে গেলে হয়?” নিজে station-এ গেল মা’কে তুলে দিতে। মা তাকে আশ্বাস দিয়ে বলে “আরে ধুর পাগল, আমি তো ভালো হওয়ার জন্যই যাচ্ছি। তাছাড়া তোকে এখানে ফেলে রেখে আর কতদিন থাকতে পারব বল?” মায়ের শেষ কথাটা শুনে মুখে হাসি ফুটল ছেলের। সত্যি তো! আর মা না এলেও সে নিজে আবার দৌড়ে চলে যাবে নাহয়। তারপর মাস কেটে যেতে লাগল, মা-ছেলের মধ্যে চিঠি আনাগোনা চলতে থাকল। ছেলেটা চিঠিগুলো অমূল্য সম্পদের মত জমিয়ে রাখত, কাউকে হাত দিতে দিতনা। তার মামি অবশ্য এসবের মর্ম বুঝতেননা। ব্যাঙ্গ করে বলতেন “ওই কাগজের টুকরোগুলো এবার ঘর থেকে বিদেয় কর দেখি।”
তারপর একদিন খবর এল, তার মা মারা গেছেন। তাঁর দাদা যার বাড়িতে গিয়ে তাঁকে রেখেছিলেন, সেই বাড়িরই কারুর থেকে তাঁর Pox ধরে গেছিল। ভাঙ্গা হাত, Pox-এর যন্ত্রণা আর সঠিক চিকিৎসার অভাবে হয় তাঁর মৃত্যু। ছোট্ট দশ বছরের ছেলেটির যেন জগৎ চুরমার হয়ে গেল। সে কাকে দোষ দেবে, কার কাছে যাবে কিছু ভেবে পেল না। ঘটনাটা তার কাছে এক দুঃস্বপ্নের মত মনে হল, যেন এ হতে পারেনা, কেউ যেন তার সাথে মজা করছে। কারণ যাওয়ার আগে এক ভাঙ্গা হাত ছাড়া তার মায়ের তো আর কিছুই হয়নি। তাহলে কিকরে...? মামাকে জিজ্ঞেস করল “তুমি যে বললে মা ভালো হয়ে যাওয়ার জন্য যাচ্ছে”। তার মামার কাছেও সেদিন সেই প্রশ্নের কোনো উত্তর ছিল না।
এরপর সময় কেটে যায়। বাবা-মা ছাড়া ছেলেটা বাঁচতে শেখে। স্নাতকোত্তর অবধি পড়াশুনা করে ভারতীয় সেনায় যোগদান করে। বিয়ে-সংসার সবই করে আসতে আসতে। কিন্তু বয়স এবং অভিজ্ঞতার সাথে সে যেন মায়ের কষ্টটা আসতে আসতে অনুভব করতে পারে। ছোটবেলা তে সে দুঃখ পেয়েছিল মা চলে যাওয়ার জন্য। তারপর সারা জীবন তার দুঃখ হত মায়ের কষ্টের কথা ভেবে। কখনও নিজে চোট পেলে বা রোগ হলে, সে মায়ের দুঃখটাকে বোঝার চেষ্টা করত।
সত্তর বছর পর সেই ছেলেটার মুখে এই ঘটনাগুলো শুনতাম, তখনও তার মুখে তার মায়ের কথা শুনতাম। শেষ বারের মত যখন তাকে দেখি, তখন সে Diabetes ও Heart-এর রোগে জর্জরিত। ব্যাথায় যন্ত্রণায় কাতর হয়ে চোখবুজেও সে মনে করত তার মা’কে। বলত “আমার মা খুব কষ্ট পেয়েছিল জানিস”। মনে হত যেন আজও তার আক্ষেপ, যে সে তার মায়ের চিকিৎসা করাতে পারেনি...মনে হত, এখনও পারলে হয়ত সে দৌড়ে যায় মায়ের খোজে। হয়ত কোনো সমান্তরাল বিশ্বে সে পেয়েছে তার মা’কে।
(আমার স্বর্গীয় দাদুর উদ্দেশ্যে। তিরোধানঃ ২৪-এ জুন ২০১৫)
Subscribe to:
Post Comments (Atom)
No comments:
Post a Comment